Skip to content
    Home » মিতা

    মিতা

    বিদ্যুৎ চলে গেছে। অন্ধকার ঘরটায় বিজলীর আলো লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে। বিরক্তি চলে আসে। হয় আলো না হয় অন্ধকার, লুকোচুরি ভাল লাগছেনা। বিছানা থেকে উঠে মোবাইলটা টিপ দিতেই বিরক্তিটা আরেকটু বেড়ে যায়। সাতটার সময় ঘুমিয়েছে এখন কিনা নয়টা বাজে। বসে ভাবছে বাহির থেকে একটু হেটে আসি। হাটলে সময়টা কেটে যায়, একটু পরিশ্রমও হয়। রাত যা বাকি আছে ভাল ঘুম হলে কালকের দিনটাও ভাল কাটবে।

    বৈশাখের রাত। কালো মেঘগুলো সামাজিক দুরত্ব মেনে ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে। সবগুলো তারা মেঘেরা ঢেকে দিতে পারেনি। বৃষ্টি হতে এখনও ঘন্টা দুই বাকি। একটা বিড়ি অবশিষ্ট আছে। মন্টু মিয়ার দোকান থেকে বিড়িটা জ্বালিয়ে নেয়। গেঞ্জিটা কাধের উপর ফেলে হাটতে শুরু করে। মেঘেদের গর্জন বাড়ছে, বাতাস শুরু হয়েছে। রাস্তায় ছড়ানো খড়গুলো তড়িঘরি করে জমাতে শুরু করেছে কৃষক-বধুরা। আবারও বিদ্যুৎ বিভ্রাট। হঠাত অন্ধকারে ঘিরে ফেলে চারদিক। বাতাসের গতি বাড়ছে। রাস্তার বাশগুলো অট্রহাসিতে মাটিতে লুটিয়ে পরতে চাইছে যেন।

    আমগুলো পাকা রাস্তায় পড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। যেগুলো টিনের চাল থেকে রাস্তায় এসে পড়ছে সেগুলো কুড়াচ্ছে ছেলে-বুড়া-বুড়িরা। লুঙ্গিতে ঘষা লেগে বিড়ির আগুন নিভে যায়। বাতাসের তীব্রতায় শ’খানেক স্ফুলিঙ্গ বাতাসদের সঙ্গ দেয়। রাস্তার লোকগুলো ছুটাছুটি করছে। একটি আমের ডাল গজ দুয়েক পেছনে ভেঙ্গে পরে। এখন রাস্তায় লোক নেই। সামনের দিক থেকে একজন লোক দৌড়ে আসছে।

    -ভাই তুফান আইতাছে

    বিজলীর আলোয় ঘর-বাড়ি-গাছ-মানুষ স্পষ্ট দেখা যায়। সামনের বাড়িটা তুলনামুলক স্পষ্ট। প্রকান্ড আঙ্গিনা, পাশাপাশি চারটি দু’চালা ঘর। একটি ইউকিলুপ্টাস গাছ। গাছের গায়ে এক পা পেছন দিকে লাগিয়ে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। হলুদ শাড়ি, লাল ব্লাউজ। নির্বিকার । একবার ঘার ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ফের মেঘ দেখে।

    রাস্তার এই মোড়টাতে ঝোপ-ঝাড়ের আধিপত্য। গাছেদের আড়াল ভেদ করে বিজলীর আলো পৌছায় খুবই ক্ষীণ আকারে। রাস্তা কম। মোড় ঘুরলেই ঝোপ-ঝাড় নেই। পেছনে ভাঙ্গনের শব্দ, একবার গাছ, একবার ঘর, একবার নারী।

    -ও আল্লাগো, তুমি এইডা কি করলা

    মোড় থেকে ২০-২৫ গজ এগুলে বিল। বিলের পার ধরে কাঁচা রাস্তা। বাতাসের গতি দিগুন হয়েছে এবার। গান ধরতে গিয়েও আর ধরা হয়না। মুখ খুলতেই বাতাস হুরমুর করে ঢুকে পড়ছে। পেট চুপসে বুক ফুলে যায়। বিলের পানিতে তোলপাড়। ঝড়ের কবলে পড়া বিলটি রাতের আধারে চুপি চুপি মহাসমুদ্রের রুপ ধারণ করেছে। তুমুল ঝরের বুক চিরে হাটতে থাকে।

    -কে তুমি?

    -ঝড়, তুমি?

    -তুমি ঝড় হলে আমি কে?

    -আমি কি করে জানব?

    -ঝড় ভাঙ্গে, তুমি ভাঙ্গোনি কিছু। সবাই আমাকে ঝড় বলে তোমাকে নয়।

    -তোমার নাম ছিলনা কোন, আমি তোমাকে দিয়েছিলাম

    -মিথ্যে, তুমি মানুষ। তুমি মৃত্যু খুজে বেড়াও

    -কে বলেছে

    -দেবী

    -মিথ্যে বলেছে দেবী

    -দেবী মিথ্যা বলেনা। আমরা আজ মৃত্যু নিয়ে আসিনি

    -আবার কবে আসবে মৃত্যু নিয়ে?

    -মৃত্যু ফুরিয়ে গেছে, মৃত্যুর আর জন্ম হবেনা

    -আমার কাছে একটা মৃত্যুবীজ অবশিষ্ট আছে

    -আমারা তাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি

    -আমার বাসরে দেবীর নিমন্ত্রণ।

    -দেবী প্রয়োজনের উর্ধ্বে

    -তবে আমিও মৃত্যুচাষী

    -আমরা এখনি অস্তিত্বহীন হব

    দশ মিনিটের মত ঝর হয়। এখন বাতাস অনেক কমে এসেছে। পাশের বাড়ি থেকে একজন টর্চ হাতে বাইরে আসে।

    -বাইরে কেন ভাই, বাড়ির ভেতরে যান

    -না, যাইগা

    -কই যাবেন?

    -সামনে

    জুতার তলাটা একেবারে মসৃণ হয়ে আছে। হাটতে গেলে বারবার পিছলে যায়। এগুনোর উপায় নেই। জুতা হাতে নিয়ে আঙ্গুল টিপে টিপে চলছে। পুটিজানা স্কুলের পুরাতন কড়ই গাছের একটি প্রকান্ড ডাল রাস্তাজুড়ে পড়ে আছে। বেশ শক্তিশালী ঝড় হয়েছে বুঝা যায়।

    এখানে এক সময় বড় শশান ছিল। শশানের চিহ্ন নেই এখন, ফসলের জমির সাথে মিশে ফসল ফলানোয় ব্যস্ত। রাস্তার পাশের ঘন জঙ্গল কিছুটা শক্তি হারিয়ে আগের মতই নিস্তব্ধ আর অন্ধকার। কুনো ব্যাং আর ঝি ঝি পোকারা সুর ধরেছে।

    দুই একজন করে রাস্তায় বের হচ্ছে। পাতায় জমে থাকা জল একফোটা করে পড়ছে। শরীর ক্লান্ত হয়নি। গেঞ্জিটা গায়ের উপরই ছিল বৃষ্টির সময়।

    রাত্রি এগারোটা! এই গ্রামের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সকাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাবেনা। অন্ধকারে ভেজা লুঙ্গিটা ছেড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।

    -স্থির হও, কি চাও?

    -তুমি জানো

    -তুমি সত্য চাও

    -হুম

    -কাকে মিথ্যা বলছ?

    -প্রেম, মৃত্যু, জীবন

    -মিথ্যেরা সত্য। আর তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও

    -সে আমার অধিকার

    -দরজা খোল

    বেড়ার ফাঁক গলে সুর্যের আলো ঢুকে পড়ছে। ভাবতে থাকে গত রাতে ঝর হয়ে যাওয়ার কথা। দরজার শব্দে ভাবনা স্থির হতে পারেনা। চোখ ডলতে ডলতে দরজার খিল খুলে দেয়। দরজার সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে মিতা। চোখ দুটো টলমল, ভাষাহীন।